যুক্তরাষ্ট্রে ঘুস-জালিয়াতির অভিযোগে বেশ বিপাকে পড়েছেন ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি। গত বুধবার (২০ নভেম্বর) নিউইয়র্কের একটি আদালতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঘুসকাণ্ডে জড়িত এবং বিষয়টি গোপন রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে অর্থও সংগ্রহ করেছেন।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় উদযাপন করে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও অবকাঠামোগত প্রকল্পে ১০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন আদানি।
কিন্তু এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ৬২ বছর বয়সী এই ভারতীয় ধনকুবেরের বিরুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে প্রতারণা সংক্রান্ত অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগের প্রভাব পড়তে পারে তার ১৬ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে, যার মধ্যে বন্দর পরিচালনা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন রয়েছে। শুধু তাই নয় আদানির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে দেশে-বিদেশে বিস্তৃত তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপরেও।
ফেডারেল প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার ব্যবসায়িক প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহ করার সময় আদানি এই তথ্য গোপন করেছিলেন যে, ওই বরাদ্দ তিনি পেয়েছেন ২৫ কোটি ডলার ঘুস দিয়ে।
ফেডারেল প্রসিকিউটরদের আরও অভিযোগ, ২০ বছর ধরে ২০০ কোটি ডলারের মুনাফাযুক্ত চুক্তি পেতে আদানি ও তার গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা ভারতীয় কর্মকর্তাদের ঘুস দিয়েছেন। তবে আদানি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
কিন্তু এই পুরো বিষয়টি এরই মধ্যে আদানি গোষ্ঠীর পাশাপাশি ভারতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। বৃহস্পতিবার ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বাজার মূল্য খুইয়েছে আদানি গোষ্ঠীর অধীনস্থ সংস্থাগুলো। এর ফলে তার ১০টি সংস্থার কম্বাইন্ড ক্যাপিটাল ক্যাপিটালাইজেশন বা সম্মিলিত বাজার মূলধন ১৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সংস্থা ‘আদানি গ্রিন এনার্জি’র পক্ষ জানানো হয়েছে তারা ৬০ কোটি ডলারের বন্ড অফার নিয়ে আর এগোবে না।
এদিকে, আদানির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রভাব ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনীতিতে কতটা প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় অবকাঠামো ব্যবসায়ী গৌতম আদানির সঙ্গে দেশটির অর্থনীতির গভীর সংযোগ রয়েছে। তিনি ১৩টি বন্দর (৩০ শতাংশ শেয়ার), ৭টি বিমানবন্দর (যাত্রী ট্র্যাফিকের ২৩শতাংশ) পরিচালনা করেন। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিমেন্টের ব্যবসাও (বাজারের ২০শতাংশ) তার।
এছাড়া ছয়টি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী আদানি গ্রুপ ভারতের এনার্জি সেক্টরের বৃহত্তম বেসরকারি খেলোয়াড়। একইসঙ্গে তিনি গ্রিন হাইড্রোজেন খাতে পাঁচ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ৪ হাজার কিলোমিটার (৪ হাজার ৯৭০ মাইল) দীর্ঘ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনও পরিচালনা করে আদানি গোষ্ঠী।
আদানি ভারতের দীর্ঘতম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছেন। ভারতের বৃহত্তম বস্তির পুনর্নির্মাণও করছে তার গোষ্ঠী। গৌতম আদানির অধীনস্থ সংস্থাগুলো ৪৫ হাজারের বেশি লোককে নিয়োগ করলেও তার ব্যবসা কিন্তু দেশব্যাপী লাখ লাখ মানুষকে প্রভাবিত করছে।
তার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার তালিকায় রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় কয়লা খনি পরিচালনা, কেনিয়া ও মরক্কোর বিমানবন্দর পরিচালনা ও জ্বালানি প্রকল্প। তানজানিয়া এবং কেনিয়া জুড়ে একশো কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের অবকাঠামোগত প্রকল্পের উপরেও আদানি গোষ্ঠীর নজর রয়েছে।
আদানির বিস্তৃত পোর্টফোলিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত করে। উদাহরণস্বরূপ অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সাম্প্রতিক সময়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর মনোনিবেশ।
নরেন্দ্র মোদী এবং গৌতম আদানি দু’জনেই কিন্তু গুজরাটের। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন থাকার সময় থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আদানির সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে সমালোচকরা আদানি গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ (এমন এক ধরনের অর্থনীতি যেখানে রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে কোনো ব্যক্তি বিশেষ বা গোষ্ঠী অনুগ্রহ লাভ করে বা বিশেষ সুবিধা পায়) হিসাবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।